Ticker

6/recent/ticker-posts

Ad Code

কে এই আশিক চৌধুরী, জানেন কি?

 

আশিক চৌধুরী

মানুষের মধ্যে সবসময়ই অজানাকে জানার এবং অসম্ভবকে সম্ভব করার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা কাজ করে। তবে কারও কারও মধ্যে এই বাসনা আরও প্রবল হয়ে ওঠে। তেমনই একজন বাংলাদেশের আশিক চৌধুরী।

পাইলট পরিবারের সন্তান আশিক ছোটবেলা থেকেই আকাশ আর মেঘের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন। যদিও পেশায় তিনি একজন ব্যাংকার, তবুও আকাশে ওড়ার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন। বিমান চালানোর দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি অন্তত ৫০ বার হাজার ফুট উচ্চতা থেকে স্কাইডাইভ করেছেন। অর্জন করেছেন স্কাইডাইভারের আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেট। তার অন্যতম অর্জন ৪২ হাজার ফুট উচ্চতা থেকে লাফ দিয়ে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নিজের নাম স্থান করে নেওয়া।

তবে সম্প্রতি নতুন এক পরিচয়ে আলোচনায় উঠে এসেছেন আশিক চৌধুরী। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর, গত সেপ্টেম্বরে তিনি নিযুক্ত হন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই ৪১ বছর বয়সী আশিক তার দক্ষতা, প্রেজেন্টেশন স্কিল ও নেতৃত্বগুণে মানুষের মন জয় করে নিচ্ছেন।

গত ৯ এপ্রিল, বিনিয়োগ সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি তথ্যসমৃদ্ধ ও সাবলীল উপস্থাপনার মাধ্যমে দেশের সম্ভাবনাময় খাতগুলো তুলে ধরেন। তার প্রেজেন্টেশনের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই মুহূর্তেই তা ভাইরাল হয়ে যায়। বিলাসবহুল জীবন ছেড়ে দেশের প্রয়োজনে নিজেকে নিবেদিত করায় নেটিজেনদের প্রশংসায় ভাসছেন আশিক। সামাজিক মাধ্যমে তাকে নিয়ে জানার আগ্রহ বেড়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত।

আশিক চৌধুরীর জন্ম চাঁদপুরে হলেও, বাবার চাকরির কারণে শৈশব কেটেছে যশোরে। পরে পড়াশোনার জন্য ভর্তি হন সিলেট ক্যাডেট কলেজে, সেখান থেকেই স্কুল ও কলেজ পর্যায়ের শিক্ষা শেষ করেন। এইচএসসি পাস করে তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউট (আইবিএ)-তে।

পেশাগত জীবনে তার যাত্রা শুরু হয় ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোতে অঞ্চলিক কর্মকর্তা হিসেবে। একই বছরের আগস্টে তিনি যোগ দেন স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে, যেখানে ২০১১ সালের মার্চ পর্যন্ত লেন্ডিং স্ট্র্যাটেজি ও ফিন্যান্সিয়াল প্ল্যানিং বিভাগে ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময়ের মধ্যেই তিনি বাংলাদেশের প্রথম স্পোর্টস বার ‘দ্য বেঞ্চ’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

২০১২ সালের অক্টোবর মাসে আশিক চৌধুরী লন্ডনে আমেরিকান এয়ারলাইন্সে ফিন্যান্সিয়াল ও স্ট্র্যাটেজিক অ্যানালিস্ট হিসেবে যোগ দেন। দীর্ঘ সাত বছর সেখানে কাজ করার পর ২০১৯ সালের মে মাসে ইউরোপ ও এশিয়ার ফাইন্যান্স প্রধানের দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেন।

শিক্ষাক্ষেত্রেও অবদান রয়েছে তার। তিনি বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে কাজ করেছেন এবং গ্রামীণ টেলিকম ট্রাস্টের উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

পরে তিনি সিঙ্গাপুরে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এইচএসবিসির রিয়েল অ্যাসেট ফাইন্যান্স বিভাগে অ্যাসোসিয়েট ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। যদিও অফিস ছিল সিঙ্গাপুরে, মাসের বড় একটা সময় কাটাতেন বাংলাদেশ ও ভারতে। পেশাগত কৃতিত্বের জন্য তিনি ব্রিটিশ কাউন্সিল বাংলাদেশ থেকে একটি সম্মানজনক অ্যাওয়ার্ডও লাভ করেন। ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তিনি ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফাইন্যান্স ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকিংয়ের অ্যাসোসিয়েট ডিরেক্টর ছিলেন।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের প্রেক্ষিতে আশিক চৌধুরীকে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পান। সর্বশেষ, ২০২৫ সালের ৭ এপ্রিল তাকে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা প্রদান করা হয়।

কর্মজীবনের ব্যস্ততা থেকে ছুটি পেলেই আশিক চৌধুরী ছুটে যেতেন রোমাঞ্চের খোঁজে। ২০১১ সালে তিনি পড়াশোনার জন্য যান যুক্তরাজ্যে, আর সেখানেই ২০১২ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর প্রথমবারের মতো স্কাইডাইভিংয়ের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। আকাশে উড়ার স্বপ্নটি তার মনে গেঁথে যায় শৈশবেই—পাইলট বাবার প্রভাবেই মহাশূন্যে পাখির মতো উড়ার কল্পনা ছিল তার নিত্যসঙ্গী।

পেশায় ব্যাংকার হলেও সাহসিকতা আর অ্যাডভেঞ্চারের প্রতি ভালোবাসা আশিককে সিঙ্গাপুর ও ঢাকা—দুই শহরের কর্মব্যস্ত জীবনের ফাঁকেও আকাশ থেকে লাফিয়ে পড়ার মতো ঝুঁকিপূর্ণ খেলায় মেতে উঠতে অনুপ্রাণিত করেছে। ২০১২ সাল থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত তিনি প্রায় ৫০ বার স্কাইডাইভ করেছেন।

যুক্তরাজ্যে এক বছর ধরে পাইলট প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর তিনি প্রাইভেট পাইলটের লাইসেন্স অর্জন করেন। এরপর থাইল্যান্ডের ‘থাই স্কাই অ্যাডভেঞ্চার কোম্পানি’-তে দীর্ঘ প্রশিক্ষণ নিয়ে স্কাইডাইভিংয়ের আনুষ্ঠানিক সার্টিফিকেট লাভ করেন। এই লাইসেন্সের মাধ্যমে বিশ্বের যেকোনো দেশে স্কাইডাইভিং করতে পারেন তিনি।


আশিক চৌধুরী

গিনেস ওয়ার্ল্ডে রেকর্ড।

উড়ন্ত বিমান থেকে বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে ঝাঁপ দেওয়ার মাধ্যমে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে নাম লেখান আশিক চৌধুরী। গিনেসের 'গ্রেটেস্ট ডিসট্যান্স ফ্রিফল উইথ আ ব্যানার/ফ্ল্যাগ' শাখায় আগে রেকর্ডটি ছিল ভারতের স্কাইডাইভার জিতিন বিজয়ানার। গত বছরের জুলাই মাসে এই রেকর্ডটি নিজের করে নেন আশিক। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস তাদের ওয়েবসাইটে ইতিমধ্যে তার তথ্য হালনাগাদ করেছে।

২০২৪ সালের ২১ মে রাতে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে উড়াল দেন আশিক। যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছে দুই দিন অনুশীলন করার পর, আবহাওয়া অনুকূল থাকায়, পূর্বনির্ধারিত সময় অনুযায়ী তিনি ৪১,৭৯৫ ফুট উচ্চতায় উড়ে যাওয়া বিমান থেকে ঝাঁপ দেন। বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকাটি দুই হাতে ধরে আকাশে ভাসতে থাকেন তিনি। প্রায় চার হাজার ফুট উচ্চতায় পৌঁছানোর পর প্যারাস্যুট খুলে সফলভাবে মাটিতে অবতরণ করেন।

এই রেকর্ড গড়ার প্রচেষ্টাটি যুক্তরাষ্ট্রের মেমফিসের উইংস ফিল্ড বিমানঘাঁটি থেকে চালান তিনি। নিরাপদভাবে মাটিতে ফিরে আসার পর গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সময় আশিক চৌধুরী বলেছিলেন, "কাজটি সফলভাবে করতে পেরে আমি খুবই শান্তি অনুভব করছি। আশা করি, দেশের জন্য এটি একটি বড় রেকর্ড হয়ে থাকবে।

Read More...

Post a Comment

0 Comments